কানাডা তাদের নাগরিকত্ব আইনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে, যা বিদেশে জন্ম নেওয়া কানাডীয় নাগরিকদের সন্তানদের জন্য দীর্ঘদিনের জটিলতা দূর করবে। ‘সেকেন্ড-জেনারেশন কাট-অফ’ নামে পরিচিত যে সীমাবদ্ধ নিয়ম এতদিন বিদেশে জন্মানো বা দত্তক নেওয়া সন্তানদের নাগরিকত্ব পাওয়ায় বাধা সৃষ্টি করেছিল, সেটি বাতিল করতে সরকার বিল সি-৩ অর্থাৎ Citizenship Act (2025) Amendment পাস করেছে। নতুন এই আইন সম্প্রতি রয়্যাল অ্যাসেন্ট পাওয়ার মাধ্যমে কার্যকর হওয়ার জন্য প্রস্তুত, যা কানাডার নাগরিকত্ব ব্যবস্থায় এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দেবে।
সরকারের মতে, এই পরিবর্তন নাগরিকত্ব আইনে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করবে এবং আধুনিক বৈশ্বিক বাস্তবতায় কানাডীয় পরিবারের কাঠামোকে বিবেচনায় আনবে। নতুন আইনের ফলে পূর্বে বাদ পড়া বহু কানাডীয় এখন তাদের বিদেশে জন্মানো বা দত্তক নেওয়া সন্তানদের কাছে নাগরিকত্ব পৌঁছে দিতে পারবেন, যদি তারা কানাডার সঙ্গে যথেষ্ট দৃশ্যমান ও প্রমাণযোগ্য সম্পর্ক দেখাতে পারেন। এভাবে কানাডীয় পরিচয় শুধু জন্মস্থান বা অবস্থান দ্বারা সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পরিবারগত বন্ধন ও মাতৃদেশের প্রতি সংযোগের ওপর গুরুত্ব পাবে।
আইনটি কবে থেকে কার্যকর হবে তা এখনো ঘোষণা করা হয়নি। এটি অর্ডার-ইন-কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্ধারিত তারিখে কার্যকর হবে, যা পরে জনগণের কাছে প্রকাশ করা হবে। ততদিন পর্যন্ত পুরোনো প্রথম-প্রজন্ম সীমার আওতায় থাকা ব্যক্তিদের জন্য অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা চালু থাকবে, যাতে কেউ আইনি জটিলতায় না পড়েন। কানাডার ইমিগ্রেশন, রিফিউজি ও সিটিজেনশিপ মন্ত্রী লিনা মেটলেজ ডিয়াব জানিয়েছেন, এই আইন দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর সমাধান এনে দেবে এবং বিদেশে বসবাসরত কানাডীয় পরিবারদের জন্য ন্যায্যতা নিশ্চিত করবে। তার ভাষায়, এটি নাগরিকত্ব আইনে এমন একটি আধুনিক ও স্পষ্ট কাঠামো তৈরি করবে যা ভবিষ্যতের পরিবার কাঠামোর সঙ্গে আরও ভালোভাবে মানিয়ে যাবে।
পুরোনো আইনটি ২০০৯ সালে চালু হওয়া ‘প্রথম-প্রজন্ম সীমা’ নামের একটি বিধানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। এই নিয়ম অনুযায়ী, যদি কোনো কানাডীয় অভিভাবক নিজেই বিদেশে জন্মে থাকেন, তবে তার বিদেশে জন্মানো সন্তান স্বয়ংক্রিয়ভাবে কানাডীয় নাগরিকত্ব পেত না। ফলে বহু কানাডীয় পরিবার—বিশেষ করে যারা কাজ বা পড়াশোনার কারণে বিদেশে থাকতেন—চরম সমস্যার মুখে পড়েন। তারা কানাডার সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও নিজেদের সন্তানদের নাগরিকত্ব দিতে পারতেন না। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে অন্টারিও সুপিরিয়র কোর্ট এই আইনের কিছু ধারা অসাংবিধানিক ঘোষণা করে, এবং সরকারও এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল না করে বরং নতুন, আরও মানবিক আইন তৈরির পথে হাঁটে।
নাগরিকত্ব আইন পরিবর্তন নিয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে বিভিন্ন জায়গা থেকে। 'লস্ট কানাডিয়ানস' সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ডন চ্যাপম্যান বলেছেন, বৈশ্বিক সমাজে কানাডীয় পরিবারগুলোর চলাচল ও জীবনযাত্রা বিবেচনায় এই আইনটি সময়োপযোগী। তার মতে, নাগরিকত্ব পাওয়ার পথকে আরো ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত করে কানাডা নিজেদের বৈশ্বিক পরিচিতিকে আরও শক্তিশালী করছে।
সব মিলিয়ে, বিল সি-৩ কানাডার নাগরিকত্ব ব্যবস্থায় এমন এক নতুন সুযোগের দরজা খুলে দিয়েছে, যা বিদেশে জন্মানো হাজারো কানাডীয় পরিবারকে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও বঞ্চনা থেকে মুক্তি দেবে। এই আইন কার্যকর হলে নাগরিকত্ব প্রাপ্তির পথ আরও পরিষ্কার, সহজ এবং মানবিক হবে—যা আধুনিক, বৈচিত্র্যময় কানাডীয় সমাজের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।